লকডাউন বনাম ক্ষুধা

মানুষ আর কত ঘরে থাকবে? ঘরে থাকুন ঘরে থাকুন বলে মানুষকে আর কয়দিন আটকে রাখা যাবে? বাংলাদেশে ত মানুষ অনেকদিন ঘরে থেকেছে। অন্তত আমেরিকার মত লকডাউন তুলে দেয়ার জন্য বিক্ষোভ করেনি। প্রথমদিকে প্রায় সকল মানুষই ঘরে থেকেছে। সময়ের আবর্তে বেরিয়ে এসেছে বা আসতে বাধ্য হয়েছে। পকেটে টাকা নেই, ঘরে খাবার নেই। সাময়িক সাহায্যে ক'দিন চলে?

আজকের ঘটনা বলি, আমার বাসার সামনে ১৫-২০ জন করে মহিলা ও পুরুষ দলে দলে প্রায় সারাদিনই এসেছে। বেড়াতে নয়, সাহায্যের আশায়। আমার কাছে নয়। এখানে একজন নির্বাচিত জনপ্পতিনিধি রয়েছেন, তাঁর কাছে। কিন্তু বাসার কাজের লোক জানিয়ে দেয় তিনি বাসায় নেই। তারপরও তারা ঘুরে ফিরে আসে। এই মানুষগুলোর মুখে গভীর অসহায়ত্বের চাপ খুব সুস্পষ্ট ছিল। মানুষ ত তাই এই মানুষগুলোকে শুন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়া কি সম্ভব?

কিন্তু এদের রোজকার ক্ষুধা কে নিবারণ করবে? তাই বেরুতেই হবে? এখানে ওখানে অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে। কাল না হোক পরশু ত বেরুতেই হবে। পেটের ক্ষুধা কি করোনা সতর্কতায় মেটে?

ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। আমরা তাদের দেখে নানা রকম নেতিবাচক মন্তব্য করি। কেউ করোনার ভয়ে ঢাকা ছাড়ছে আবার কেউ তাদের গোটা অতীত পেছনে ফেলে মা বা সন্তানের কাছে ছুটে যাচ্ছে। এদের অনেকেই জানে আবার ফিরে গিয়ে ঐ আগের কাজ নাও পেতে পারে কিংবা আদৌ ফিরতে পারবে কিনা। মানুষ মরতে চাইলেও স্বজনের কাছে মরতে চায়! করোনা নিয়ে পালিয়ে যাবার অনেক ঘটনা ঘটেছে। সবাই এক দৃষ্টিতে বিচার করে ওদের ফাঁসি দিতে চেয়েছেন। আমিও কি এর মধ্যে ছিলাম? করোনা আক্রান্ত হলেই যে মৃত্যু সুনিশ্চিত নয়, এই কথাটিও অনেকে জানে না এখনো। ১৯১৮ -১৯২০ সাল পর্যন্ত মানুষ এমনটি করেনি? তখনও তারা মানুষ ছিল। যদিও দুই ব\সরে বিশ্বের জনসংখ্যা ৫ কোটি কমে গিয়েছিল। মানুষের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়নি। এ যাব\ আবিষ্কৃত কোনো ভাইরাস লড়াইয়ে মানুষের সাথে পেরে ওঠেনি। করোনাও পারবে না। যদিও এখনো অনেক ভাইরাসের প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কৃত হয়ইনি। এইডসের ইতিহাস এখনো অনেকে গোপন করে, লুকিয়ে রাখে। যদিও নিশ্চিত পরিণতি জানে।

কিছু হতচ্ছাড়া কারণে অকারণে বাইরে বেরোয়, হাটে মাঠে ঘাটে, পথে প্রান্তরে ওদের দেখা যায়। নানাভাবে শাসিত হয়, তবুও যায়। কেননা এই বাইরেটা ছাড়া এদের আর কোনো আশ্রয় নেই ত। মোবাইলে ফেসবুক আর টুকটাক গেম ছাড়া আর কিছু আছে বলে ওরা জানে না। অনলাইন সংবাদপত্রে করোনা ছাড়া কিছুই পড়ার নেই। টিভি চ্যানেলগুলোতে কিছু দেখার মত নেই। বাংলাদেশের অদিকাংশ টিভি চ্যানেলগুলোতে যেসব বিষয় দেখানো হয়, তা এই বাইরে যাওয়া গোষ্টির উপভোগের বাইরে। তারা এসব শুনতে বা দেখতে চায় না। যাদের বাসায় পিসি আছে, এদের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা অনেকটা কম। কেননা এর আর কিছু না হোক, অনেক দীর্ঘ গেম খেলতে পারে। অনেকে ইউটিউবের মত মাধ্যমে হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে সময়টা পার করে দেয়।

কিন্তু যাদের ক্ষুধা আছে? গার্মেন্টসের এই জনস্রোত কখনো মৃত্যুকে তোয়াক্কা করেনি। কেননা এখানে অনেকেই ক্ষুধার সাথে পরিচিত। ঘরে তুলে খাবার দেয়ার পরেও কানাডার মত দেশের মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। যদি সবাই নিষেধাজ্ঞা মানত, অন্নত যাদেরকে সভ্য জাতি হিসেবে পরিগণিত করা হয়, তারাই যদি মানত, তবে মৃত্যু সংখ্যাটা এত বিশাল হত না। সবাই সবকিছু পারে না। বাংলাদেশের মানুষ ইদানিং এসে নানাবিধ কারণে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠেছে। মুলত আমাদের বড়ো বড়ো সবাই শুধু নিষেধাজ্ঞা দিতেই অভ্যস্ত। মানুষের যে পেটের ক্ষুধার সাথে মনের ক্ষুধাও আছে, সে বিষয়টি খুবই উপেক্ষিত হয়েছে। এখনো হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা যদি অমান্যই না করল, তবে মানুষ তার মানবীয় ধর্ম হারাল।

আমি কিছুতে মানুষকে বাইরে বেরুতে উৎসাহিত করছি না। আমারও আহবান, সবাই সরকারের নির্দেশনা মেনে চলুন। তবে নীতি নির্ধারণী মহলের প্রতি অনুরোধ, মানুষকে ঘরে থাকার এবং রাখার পর্যাপ্ত না হলেও আংশিক উপকরণ যোগান দিন। তারপর আপনাদের হুকুম তামিল করুন। মানুষকে ঘরে আটকে রাখবেন আর তারা ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করতে করতে মরবে- এটা কোনো কালেই সম্ভব নয়। শিশু কিশোর যুবকদের মনের খোরাক দিন। এটা চাইলেই অনেক টিভি চ্যানেল করতে পারত। নতুন না হলেও পুরাতন বিষয়গুলোকে নতুনভাবে উপস্থাপনার দায়িত্ব টিভি চ্যানেলগুলো নিতে পারত। কয়েকটি টিভি চ্যানেল যে এমনটি করছে না তা নয়। কিন্তু সাথে বিজ্ঞাপন বিরতি দিয়ে সেই গুড়ে বালি দিয়ে দেয়। মানুষের মন ত বুঝতে হবে। আদেশ মানুষ সব সময় সমানভাবে মানতে পারে না। ইসলামী মতে, মানব জাতির আদি পুরুষ হযরত আদম (আ.) শেষ পর্যন্ত আল্লাহর আদেশ মানতে পারেননি।

নীতি নির্ধারণী মহলের প্রতি আবারো বিনীত অনুরোধ, ভুখা মানুষ মরবে, জানে বাইরে বেরুলে মরণ আছে, তবুও বেরুবে। এখন উপায় আপনাদের হাতে। যদি সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে বিএনপির অবরোধ হরতালের মত লকডাউনও এর কার্যকারিতা সম্পূর্ণ হারাবে।

Comments

Popular posts from this blog

৫৪৩ দিন পর খুলছে স্কুল-কলেজ

আইন জেনে বিয়ে করুন

Let me tell a story: একটা গল্প বলি